ছোটদের বইমেলা


একদল পিচ্চি। বয়স আর কতই হবে? খুব বেশি হলে দশ কি এগারো। সবাই হুরমুর করে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে যাচ্ছে। নেড়েচেড়ে দেখছে বই। কে কার আগে দেখবে কিংবা সুন্দর বইটা বেছে তুলে ধরবে সবার সামনে, তারই যেন এক প্রতিযোগিতা! আবার বই দেখার সময় পেছন থেকে কেউ একজন মাথায় টোকা দিয়ে দিল দৌড়। শুরু হলো তার পেছনে দৌড়। কে তাকে আগে ধরতে পারে। বই দেখতে দেখতে খেলা কিংবা খেলতে খেলতে বই দেখার এই আয়োজনটাই বসেছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রাঙ্গণে। জাতীয় শিশু দিবস ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জš§দিন উপলক্ষে শুধু ছোটদের জন্য বইমেলার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী। এবার প্রতিপাদ্য ‘পড়ব যত জানব তত, বন্ধু নাই বইয়ের মতো’।
বইমেলার একটি স্টলে কয়েকজন শিশুকে দেখা গেল ছবি আঁকতে। ঝকঝকে, সুন্দর পোশাকের শিশুদের পাশে বসে ছবি আঁকছে কয়েকজন সুবিধাবঞ্চিত শিশু। এদের কারো গায়ে পোশাক নেই, কারোটা ময়লা-ছেঁড়াফাটা। তবে কারো মধ্যেই আনন্দের কমতি নেই। ওরা সবাই হালুম, ইকরি, টুকটুকি ও শিকুর ছবি আঁকছে। হালুমদের নিশ্চয়ই চিনতে কারো কষ্ট হচ্ছে না। হ্যাঁ জনপ্রিয় শিশুতোষ ধারাবাহিক সিসিমপুর এর চরিত্র এরা। বইমেলার সিসিমপুরের স্টলে শিশুরা ছবি আঁকছিল। এরই মধ্যে আবার হালুম আর ইকরি এসে হাজির! ‘ওরে বাবা, হালুম এসেছে।’ ‘কত্ত বড় হালুমটা, ইকরিও।’ শিশুরা এই রকম নানা কথা বলতে থাকে। অনেক পিচ্চি-পাচ্চাই কাছে গিয়ে সুযোগটা লুফে নেয়। হালুমের সাথে কোলাকুলি করার সুযোগ কিংবা ইকরির হাতটা ধরার। স্টলের সামনে বাড়তে থাকে পিচ্চি-পাচ্চাদের ভিড়। প্রজেক্টরের মাধ্যমে সিসিমপুর দেখানো হচ্ছে। এখানে কথা হয় সুবিধাবঞ্চিত শিশু আরিফের সাথে। স্কুলে না পড়লেও আরিফ তার নাম লিখতে পারে, ছবি আঁকতে পারে।
বনানী থেকে মেলায় মায়ের সাথে এসেছে গ্রিনডেল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থী বারীবাহ। সে এই বই ধরছে তো ওই বই। ভালো না লাগলে আবার আরেকটা। তার জন্য বইও কিনেছেন তার মা ফারহানা। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের মেলার অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। এতে বাচ্চাদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়বে। খোলামেলা পরিবেশে বাচ্চারা বেশ আনন্দও পাচ্ছে।’ বইমেলা কী শুধু বড়দের জন্যই হবে। সে মেলায় তো ছোটদের জায়গাই হয় না। বড়দের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়! বই নেড়েনেড়ে দেখার সুযোগ কই? এমনটাই জানালেন পুরান ঢাকার আরেক অভিভাবক সুজনা।
বইমেলায় মোট ৮৯ টি স্টল রয়েছে। এসবে স্টলে শিশুদের উপযোগী সারি সারি বই সাজানো। বইয়ের স্টল ছাড়াও দেখা গেল, বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর শিশুতোষ চলচ্চিত্র ও অনুষ্ঠান নির্মাণ কর্মশালার একটি স্টল। নিয়মিত হওয়া এই কর্মশালার চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থী সায়ন্ত খান পড়ে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে। সে বলে, ‘এই কর্মশালার মধ্য দিয়ে আমি একটা নতুন জগত পেয়েছি। বই পড়ার পাশাপাশি একটা চলচ্চিত্র কিংবা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের স্বপ্নগুলো তুলে ধরতে পারছি।’ আবার বায়স্কোপে পাপেট শো দেখার ব্যবস্থাও রয়েছে একটি স্টলে। মেলায় কোনো কোনো প্রকাশনা সংস্থা এনেছে নতুন বই। শিশুদের এই বইমেলাটি শিশুসাহিত্যিকদের মিলনমেলায় পরিণত হতে পারে বলে জানান তরুণ লেখক মামুন মিজানুর রহমান। এতে শিশুদের পাশাপাশি শিশুসাহিত্যিকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে মেলা প্রাঙ্গণ।

 ‘ছোটদের কেন্দ্র করে একটা মেলা হচ্ছে। পরিপাটি পরিবেশে তাদের মতো করে ঘুরছে, বই দেখছে।’ বললেন প্রতিভা প্রকাশের প্রকাশক মঈন মুরসালিন। শিশুদের বইমেলা এখনও জমে ওঠেনি। তবে সবাই আশা করছেন, গণমাধ্যমে প্রচার পেলে মেলাটি জমে উঠবে। মেলার তেমন কোনো প্রচারণা না হওয়ায় শিশুরা মেলায় আসছে না বলে জানান বাংলাপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী হুমায়ূন কবীর ঢালী। তিনি বলেন, ‘শিশুদের জন্য মেলা হওয়াটা অনেক ভালো। ঢাকা শহরের বেশিরভাগ শিশু কিংবা তাদের অভিভাবকরা জানে না যে, তাদের জন্য একটা মেলা হচ্ছে। স্কুলে স্কুলে প্রচারণা চালানো দরকার।’ আবার ভিন্ন কথাও বলছেন কেউ কেউ। একটি মেলা একদিনে জমে ওঠে না। একুশে বইমেলাও জমতে অনেক সময় লেগেছে। এজন্য প্রকাশকদেরও ধৈর্য ধরতে হবে।
আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সামনের দিনে ওরাই দেশের হাল ধরবে। তাই সুন্দর মানুষ হতে বই পড়ার কোনো বিকল্প নাই। বইয়ের সাথে শিশুদের সখ্যতা বাড়াতেই এই বইমেলা। জাতীয় শিশু দিবস ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জš§দিন উপলক্ষে গত বছর প্রথম আয়োজন করা হয় বইমেলার। তারই ধারাবাহিকতায় এ বছরও মেলার আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ শিশু একাডেমী বইমেলা ২০১২ উপ-কমিটির সদস্যসচিব শিশুসাহিত্যিক ফারুক নওয়াজ। তিনি বলেন, ‘শিশুদের এই মেলাটিও এক সময় জাতীয় উৎসবে পরিণত হবে। এতে একটু সময় লাগবে।’ প্রচারণা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্কুল থেকে প্রতিদিনই শিক্ষার্থীদের আনা হচ্ছে। এজন্য পরিবহন ব্যবস্থাও করেছে শিশু একাডেমী। এছাড়া প্রতিদিন বিকেল থেকে মেলা প্রাঙ্গণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। এতে ছোটরা অভিনয়, গান, নৃত্য, আবৃত্তি করছে। তা দেখে মেলায় আগত শিশু ও অভিভাবকরা উৎসাহিত হচ্ছে। শিশুদের জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজনও করা হয়েছে। এছাড়াও মেলায় এবার শিশু একাডেমী পুরস্কার দেওয়া হবে। একটি রঙিন স্মরণিকা প্রকাশিত হবে।
২৬ মার্চ মেলার শেষ দিন। সকাল ১১টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। 


# তানজিল রিমন

মন্তব্যসমূহ