![]() |
| অলংকরণ: সংগৃহীত |
- ড্রয়িং ভালো লাগে তোমার?
- হুম। আবার লাগেও না।
- আচ্ছা তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?
মোটেও সময় নেয় না উদয়- ভিড়অলা বাসের গেটে দাঁড়িয়ে থাকে যে, ঐটা হবো। মাহমুদ তো শুনে অবাক। বলল- ছি! এটা কেমন কথা। বাসের হেল্পার হতে চায় নাকি কেউ? ‘না আমি হবো, তাতে তোমার কী?’ বলে উদয়। মাহমুদ চুপসে যায়। ভাবে- সে গ্রাম থেকে এসেছে শহরে। আর যে ছেলে শহরেই আছে, বাবা-মা সোনার চামচে তুলে খাওয়ান, সে হতে চায় বাসের হেল্পার। আজব লাগে তার কাছে। আবার জানতে চায়- আচ্ছা, তা না হয় হয়ো। কিন্তু কেন হতে চাও? বেঁকে যায় উদয় - ‘না, তোমাকে বলবো কেন?’ মাহমুদ শুনবেই। কেন যেন আগ্রহী! তারপর রাজি করায়- ‘বললে একটা সুন্দর গল্প শোনাবো তোমায়।’ গল্পে লোভ আছে উদয়ের। এবার আরো কাছে এসে বসে মাহমুদের। ‘চুপ! শোন, আম্মুকে বলো না কিন্তু।’ ফিসফিসিয়ে বলল উদয়। ‘আচ্ছা বলবো না’ -কথা দেয় মাহমুদ। ‘গাড়িতে আম্মু যখন স্কুলে নিয়ে যায় না, তখন রাস্তায় জ্যাম লাগলে বাসগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। কেমন গরগররর শব্দ করে। আর গেটের ওই লোকটা, অ্যাই মিরপুর ১০, ১১, পল্লবী... বলে ডাকে। শুনছো তুমি কখনো? আমিও গেটে ঝুলবো আর অমন করে ডাকবো। কী মজা হবে তখন।’ মাহমুদ আরো চমকে যায়। তার ধারণা, সুখে থাকলে ভূতে কিলায়। মাহমুদের বটেই, তার বাবা-মারও স্বপ্ন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়েই সে ঢাকা ছাড়বে। ছোটবেলা থেকেই এমন স্বপ্ন তাদের। ‘গল্প শোনাবে বলেছ। এখন শোনাও।’ বলল উদয়। উদয়ের কথাশুনে মুড নষ্ট হয়ে গেছে মাহমুদের। বলল- ‘এখনি। পরে শোনাই?’ ‘নাআ। এখনি বলতে হবে।’ বায়না ধরে উদয়। মাহমুদ শুরু করে- ‘এক ছিল একটা বাড়ি..।’ কথা শেষ না হতেই আটকে দিল উদয়- এটা কেমন কথা ? ‘আরে বুঝো নাই। ঐ যে ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম’ টাইপের একটা কিছু।’ বলল মাহমুদ। ‘হু, বুঝেছি, বলো।’ আবার শুরু করে মাহমুদ- ‘বাড়িটার চারধারে শুধু গাছ আর গাছ। গাছের জন্য বাইরের কিচ্ছু দেখা যায়না। বাড়িটায় আছে শন ও টিনের পাঁচ-ছয়টা ঘর। একটা আরেকটার মুখোমুখি, সামনে বড় একটা উঠান। পাশেই একটা খড়ের গাদা। সেখানে বাঁধা আছে দুটো গরু। ও, গাছগুলোর ছায়া উঠানটাকে সবসময় ঢেকে রাখে। আর নাম না জানা পাখিরা ভিড় করে ডালে ডালে। বাড়িটার উত্তর পাশে বয়ে গেছে সুন্দর একটা খাল। খালের ধার ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো তাল গাছ, পাতায় পাতায় বাবুইয়ের বাসা। পড়ন্ত দুপুরে দূরের মাঠ থেকে ভেসে আসে রাখালের বাঁশির সুর। তার মুগ্ধ শ্রোতা- এ বাড়ির মানুষরা, এমনকি গাছ-পাখিরাও।’ এবার থামে মাহমুদ। উদয় মন দিয়ে শুনছে তার গল্প। অবশ্য গল্প বললে ভুল হবে। এটা গল্প বলে উদয়ের মতো শহুরে বালকের কাছে চালিয়ে দেয়া যায়, কিন্তু মাহমুদ জানে, সে তার গ্রামের বাড়িটার বর্ণনা দিচ্ছে। যা উদয়ের কাছে অপরিচিত। ঢাকা শহরে এসবের কিছুই নেই। গ্রামের ছেলেমেয়েরা সহজেই ধরে ফেলবে এটা মোটেও গল্প না। গল্প হোক আর যাই হোক, উদয়ের মা মানে মাহমুদের মামি দরজার বাইরে থেকে ডেকে গেলেন- ‘হয়েছে তোমাদের। আজ আর পড়তে হবে না। এবার তোমার নিজের পড়া পড়ো বাবা। উদয়কে পাঠিয়ে দাও। ওর টম-জেরি দেখবার সময় হইছে।’ হুররে বলে পড়ার টেবিল ছাড়ল উদয়। মাহমুদ কিছু বলারও সময় পেল না। ভাবল- ও, টম এন্ড জেরি। ওর প্রিয় কার্টুন। এখন কি আর ওকে রাখা যাবে?
আজ কোচিং নেই মাহমুদের। সকালে নাস্তার পর মামি ডাকলেন- মাহমুদ, নীলক্ষেত চেনো তুমি ?’ ‘না মামি।’ ‘শোনো, উদয়ের পেন্সিল, ড্রয়িং খাতা আর কিছু বই কেনা লাগবে। তোমাকে কিভাবে যেতে হবে বলে দিচ্ছি, চিনবে। আর ওখান থেকে তোমারও অনেক বই কিনতে হবে। জায়গাটা চিনে রাখলেই বরং ভালো।’ মামির কথায় মাথা নেড়ে সায় দেয় মাহমুদ। ‘ আনসার ক্যাম্প থেকে চিড়িয়াখানার বাসে উঠে শাহবাগ নামবে। নেমে জাদুঘরের পাশ দিয়ে আজিজ সুপার মার্কেট হয়ে বামে মোড় নিলেই কাটাবন, তারপর নীলক্ষেত।’ এক নিশ্বাসে পথ বাতলে দিলেন মামি। তিনি অনেকবার গিয়েছেন নীলক্ষেতে- তাই বলেছেনও চেনার মতো সহজ করে। মাহমুদ ভাবলো- শাহবাগে নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করে নেবে। অত ভাববার কি আছে! এসেছে যখন, তখন তো চিনতেই হবে এ শহরকে।
মাহমুদ তখন কাঁটাবনের কাছে। ফুটপাত ধরে হাঁটছে ‘খক-খক, খুউ-খুউ’ শব্দে পাশে ফিরল সে। সাদা রঙের চার পায়ে একটা প্রাণী খাঁচার ভেতর বসে আছে। পা গুটিয়ে-জিহ্বা বের করে হাঁপাচ্ছে। দেখে চেনা মনে হলো তার। অনেকক্ষণ দেখার পর চিনতে পারল- আরে এটা যে কুকুর! আর কিছু ভাববার সময় পেল না। দোকানি খোঁচা মেরে বলল- ‘তাকাইয়া থাহোনের কিছু নাই, এইটা বিলাতি কুত্তা।’ এবার তার চোখ আটকে যায় আরেকটি দোকানে। শত শত খাঁচাবন্দি পাখি। সবই পরিচিত। সেই পাখিরা। তখন খুব স্কুল পালাতো সে। যেতো সিকান্দারদের পুকুর পাড়ে। গাছের ডালে ডালে খুঁজতো পাখির বাসা। কখনো গুড়ির গর্তে মাথা বের করে থাকত দু‘একটা দোয়েল। পাড়ের বেতবনের ভেতর থেকে ধরে নিয়ে আসত ডাহুকের ছা। মোটা আম গাছের গা বেয়ে মগডাল থেকে পেড়ে আনত আধপশমী ঘুঘুর বাচ্চা। পিছলে পড়ার ভয় থাকলেও তার দস্যিপনায় মিশে ছিলো- কালো, বাদামি, খয়েরি রঙের পাখিরা, তাদের কিচিরমিচির। সেই পাখিদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আজ অনেকদিন পর হঠাৎ। কিন্তু এদের কেমন বেমানান লাগছে। খাঁচাবন্দি দোয়েল , টিয়া, ময়না, শালিক, ঘুঘুরা ডাকছে না। তবে এরা কী বোবা -ভাবে মাহমুদ। পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলো-‘ ভাইজান কি পাখি নিবেন?’ এবার নীলক্ষেতের উদ্দেশে হাঁটা শুরু করে মাহমুদ।
বিকেলে বাসায় ফেরে। নীলক্ষেত চেনা হয়েছে তার। সঙ্গে আরো অনেক কিছু। কাটাবনে খাচাবন্দি পাখিগুলোকে দেখার পর থেকে তার মন বেশ খারাপ। নীলক্ষেতে প্রয়োজন সেরে দেরি না করে চলে আসে। ‘উদয় কোথায়, মামি?’ জানতে চায় মাহমুদ। ‘কোথায় আবার, বারান্দায় গিয়ে দ্যাখো, তোমার মামা কি এক পাখি এনেছে, তা নিয়েই আছে বাবা-ছেলে।’ বললেন মামি। শুনে, আঁতকে উঠলো মাহমুদ। নিশ্চয়ই কাটাবনের মতো খাঁচাবন্দি কোনো পাখি হবে। কৌতূহলে গেল বারান্দায়। একটা ময়না এনেছেন মামা। উৎসাহে, খাঁচায় বারবার হাত পিটিয়ে পাখিটার সঙ্গেই আছে উদয়। অন্যদিকে খেয়াল নেই। মাহমুদকে দেখে মামা বললেনÑ দেখো, কী সুন্দর ময়না এটা।’ বলেই ঘরে ঢুকলেন মামা। মাহমুদ ভাবেÑ একেও আবার সুন্দর বলে শহুরে মানুষরা। আর সেকেন্দারদের পুকুর পাড়ের ময়নাগুলোকে দেখলে জানি কি বলবে! হাত দিয়ে খাঁচাটা এখনো পেটাচ্ছে উদয়। এদিক-সেদিক হেলে-দুলে পড়ছে পাখিটা। কেমন করুণ তার চাহনি, পালকের রঙ ভালো না। গ্রামের ময়নার সঙ্গে এর অনেক অমিল! পাখিটা কেমন অলস!
সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে আবার পাখিটার কথা উঠালো উদয়। বলল- ‘সুন্দর না ভাইয়া পাখিটা।’ সাড়া দিল না মাহমুদ। উদয় বলেই যাচ্ছে- ‘পোষ মেনে গেছে। জানো খাঁচাটা খুলে দিয়েছিলাম একবার, তবু যায়নি।’ মাহমুদ প্রসঙ্গ পাল্টে বলল- ‘পড়বে না উদয়?’ ‘হু পড়ব তো।’ ‘ঠিক আছে বই খুলো।’ বলল মাহমুদ। উদয়কে খানিক পড়িয়ে বিদায় করবে ভাবছে। তারপর সে বাতিটা নিভিয়ে শুয়ে পড়বে। গ্রামের কথা খুব মনে পড়ছে তার। এই সন্ধ্যায় বন্ধুরা মিলে ফড়িং ধরতে যেত বাড়ির পাশের খালপাড়ে। জোনাকিদের ডরভয় নেই। ওরা ইচ্ছেমতো ঝোঁপের ভেতর ডুবে থাকে, আবার বের হয়। কে আসল, কারা আসল- ওদের জ্বলায় ব্যাথা নেই। কেউ একজন হাতের মুঠোয় বন্দি করলেও পোকাগুলো জ্বলতো-নিভতো। বন্দি হয়েছে একথা ভাবত না। কেমন বোকার দল! এ মুহুর্তে মাহমুদ নিজেকে জোনাকি পোকার সঙ্গে মেলাচ্ছে। এ শহরের ইট-কাঠে আটকে আছে জেনেও কিছু এসে যাচ্ছে না তার। মাহমুদ আবার ফিরে আসে বইয়ের পাতায়। উদয়কে পড়া শুরু করতে বলে। বুঝতে পারে উদয়ের পড়ায় মন নেই আজ। পাখিটার মধ্যেই এখনো আছে সে। ‘ধরো, পড়া ধরো, শুরু করছো না কেন?’ তাড়া দেয় মাহমুদ। ‘হু পড়ব তো। তার আগে বলো, তুমি বড় হয়ে কি হতে চাও?’ ‘একথা কেন এখন?’ বলল মাহমুদ। কিন্তু উদয় চেপে ধরে- বলতেই হবে। খানিক চুপ থাকে মাহমুদ। তারপর বলল- আমি, আমি হবো, আমি হবো সকাল বেলার পাখি।’ বলে স্বস্তি পায় মাহমুদ। উদয় বোঝেনি। আবার প্রশ্ন করে- ‘কী হবে?’ ‘বড় হলে বুঝবে, এখন নয়।’ বলল মাহমুদ। উদয়কে আরো সহজ করে জবাবটা দেয়, নইলে সে প্রশ্ন করতে করতে বিরক্ত করে ফেলবে- ‘ওই যে আছে না, একটা কবিতা- আমি হবো সকাল বেলার পাখি/সবার আগে কুসুমবাগে উঠবো আমি ডাকি।
এরই মধ্যে ময়নাটা ‘উদয়’ বলে ডাকতে শিখেছে। তারা বেশ আছে। সব কিছু ঠিকঠাক। মাহমুদ কি ঠিক আছে? তা আমরা আরো সময় না নিয়ে বলতে পারব না। তবে মাহমুদের মা, মামা, মামি এমন কি আমি এবং তুমি সবাই জানি- মাহমুদ ঢাকায় এসেছে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হতে।
গল্পটি ফুটতে দাও ফুল শিশু উৎসব স্মরণিকায় প্রকাশিত

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন