![]() |
| অলংকরণ: মানব |
হ্যা, একটি ডায়েরি। না, না, আনা ফ্রাংকের মতো বিখ্যাত কারো ডায়েরি নয়। ডায়েরিটি রাতুলের আম্মুর। রাতুল পাঁচ বছরের ফুটফুটে এক শিশুর নাম। আরো কম বয়সে রাতে ঘুম ভাঙলে সে দেখতো, সে মায়ের বুকে শুয়ে নেই। চেয়ারে বসে আম্মু কী না কী লিখছেন। সে ভাবে, দেখো দেখো, আম্মুর সাহস দেখো, ওকে ফেলে রেখে কী সুন্দর ছাতামাথা লিখতে বসে গেল! ইস, আম্মুটা যে কেমন! ওকে একা বিছানায় রেখে গিয়ে কী ছাইপাশ যে লেখে! রাতুল কান্নায় প্রতিবাদ করে। এ রকম একটানা কান্নাকে ‘বিদ্রোহী’ কান্না বলা যায়। আর আম্মু যে তখন কেমন আদরে আদরে অস্থির করে ফেলেন! পাঁচ বছর হয়ে যাওয়ায় চেচিয়ে কাঁদতে এখন তার বিবেকে বাঁধে। এই বয়সেও পিচ্ছিমণিদের মতো কেঁদে বাড়ি মাথায় তুললে লজ্জার কথা না! তবু রাতুল বেশরমের মতো প্রায়ই চেচিয়ে কাঁদে। কান্নার সুযোগসুবিধা সে ভালোই জানে। একটু কাঁদলেই হলো, আম্মুর আদরের বান ডেকে যায়। তাছাড়া চিপস, বিস্কুট, খেলনা তো আছেই।
আম্মু তখন অনেক আদর দিয়ে, ডাইনি বুড়ির গল্প শুনিয়ে ওর চোখে ঘুম ডেকে আনে। ঘুমের দেশে যেতে যেতে রাতুলের তবু নীল খাতাটিকে পচা মনে হয়। হু: আম্মুর কাছে নীল খাতাই বড় হলো! এই খাতাটিকে সে মনে মনে নিজের শত্র“ মনে করে। কয়েক দিন ঘুম ভেঙ্গে এই ঘটনা দেখার পর সে মনে করে, যত দোষ এই খাতার। খাতার বিরুদ্ধেও কঠোর প্রতিশোধ নিতে হবে। এই খাতাটিকে আর আস্ত থাকতে দেওয়া যায় না। এক দিন ভোরে রাতুল খাতাটি হাতের কাছে পেয়ে উল্টেপাল্টে দেখে। সে খাতাটি পড়ে আসল রহস্যটি উদ্ধার করতে চায়। পড়াশোনা তো সে নেহাত কম করেনি! অ, আ, ক, খ, ১, ২, ড়হব, ঃড়ি সব ওর মুখস্ত। এ পর্যন্ত ওর পড়া হয়ে গেছে তেরোটি বই। অবশ্য পড়ার চেয়ে ছেঁড়ার পরিমাণই বেশি। আম্মুর নীল খাতা থেকে সে তিনটি প, চারটি দন্ত্য স এবং আরো বেশ কটি বর্ণ খুঁজে বের করে। কোনো ঘোড়ার ডিমই সে বুঝতে পারে না। এই নীল খাতাটির জন্য আম্মু ওকে মাঝ রাতে বুক থেকে নামিয়ে রাখে, এই খাতাটি না ছিড়লেই নয়। দুটি পাতা কুচি কুচি করার পর রান্নাঘর থেকে আম্মু এসে মসলামাখা হাতে ওর পিঠে দুই মুঠো বসিয়ে দেয়। আর নীল খাতাটি তুলে রাখে এতটাই উপরে যে, আব্বুর মতো বড় না হয়ে সে তা ছুঁতে পারবে না। ইস, পচা এই খাতাটির জন্য মারও খেতে হলো! রাতুল মুখে হাওয়া পুরে বসে থাকে।
তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো,এই খাতাটিই রাতুলের আম্মুর ডায়েরি। এতে আম্মু যে কী ছাতামাথা লিখে, তা আম্মুই জানে। আমিও অবশ্য অল্প জানি বটে! সেই গল্পই তো তোমাদের বলছি।
বিয়ের পর থেকেই আম্মু এই ডায়েরি লিখছেন। প্রথম পৃষ্ঠায় কী লেখা জানো? রাতুল পেটে থাকার সময় আম্মুর এই লেখা ‘আল্লাহ গো, তোমার দরবারে হাজারো শুকরিয়া, তুমি এই অধমের গর্ভে সোনার টুকরা দান করেছ, তমি খুব দয়াময় গো আল্লাহ, খুব দয়াময়। আমারে চাঁদের চেয়ে সুন্দর পুত্র সন্তানের মা বনিয়ো’।
প্রথম পৃষ্ঠায় এই টুকোই। আরও দুটি সাদা পৃষ্ঠা পেরিয়ে হলুদ মরিচের দাগ লেগে থাকা একটি পৃষ্ঠায় আছে, ‘আল্লাহ যদি আমার মনের আশা পুরণ করে ছেলের মা বানায়, চাঁদের চেয়ে ফকফকা আমার সোনামানিকের নাম রাখবো রাতুল। রাতুল মানে রক্তের মতো লাল। আমার সন্তান যদি ফকফকা হয়, তবে রাতুল নামটি মানিয়ে যাবে বেশ ’।
আরো তিন পাতা এগিয়ে, ‘গত পরশু বারোই ডিসেম্বর রাতুলসোনা কোলে এসেছে। খোকাটা যে কী দুষ্টু হয়েছে! দুচোখ জুড়ে তার মিটিমিটি দুষ্টুমি। জন্ম হতে না হতেই সে এতো দুষ্টু হলো কীভাবে! জন্মের আগেই কী খোকা কম জ্বালাতন করেছে! পেটের ভেতর হম্বিতম্বি করে আম্মুকে ও কম ব্যথা দিয়েছে! খোকা কী তবে আমার গর্ভ থেকেই দুষ্টুমি শিখে এসেছে! তা একটু আধটু শিখতেও পারে। আমিও তো আর ছোটবেলায় কম দুষ্টু ছিলাম না’!
আর মাত্র আধ হাত বড় হলে,স্কুলে আরো একটি ক্লাস পেরোলে রাতুল নিশ্চয়ই আম্মুর নীল খাতা পড়ে সব বুঝতে পারবে। যখন সে জানবে, আম্মুও ছোটবেলায় ওর মতোই দুষ্টু ছিল, হাসতে হাসতে তখন ওর পেটে খিদে লেগে যাবে না! দুষ্টুমির জন্য আম্মু কতো বকা দেয়, অথচ আম্মু নিজেও কি না বিরাট দুষ্টু ছিল! হি: হি:।
আরো দুটি পাতা পেরোলেই একটি কাঁচা হাতের স্কেচ। অদ্ভুত এক বালকের আঁকা ছবি। নাক মুখ দেখে তাকে চেনার কোনো উপায় নেই। কপালে তেরছা চাঁদ আাঁকা থাকলে আর নাক মুখের কোনো ছিরি না থাকলে ছবি দেখে কাউকে চেনা চাট্রিখানি কথা নয়। আমিই কি আর ছবি দেখে সেই ছেলেটিকে চিনতাম! ছবির নিচে কী লেখা জানো? ‘রাতুলসোনার কপালে চাঁদ এঁকে দিলাম, আমার সন্তানও যেন চাঁদের মতো উজ্জ্বল হয়। ও আল্লাহ, তুমি রহিম রহমান, তুমি এই পাপী মায়ের দোয়া কবুল করো। তুমিও আমার মতো রাতুলের ভাগ্যে একটি চাঁদ এঁকে দিয়ো। আমার রাতুলকে আসমানের চেয়ে বড় মানুষ বানিয়ো’।
এভাবেই পাতার পর পাতা। সবই রাতুলকে নিয়ে। হয়তো রাতুলের কোনোদিন জ্বর-সর্দি হয়েছে, কোনো দিন হয়তো পরে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে, ওর আম্মু লিখে রেখেছেন সব। তোমাদের সব কথা বলছি না। ইস, কত্তো কী যে লেখা! সব মিলিয়ে একটি নাদুস নুদুস বই-ই হয়ে যেতে পারে। আরো দুই, তিন ক্লাস বড় হয়ে যখন রাতুল এই ডায়েরি পড়বে, তার জীবনের নানা খুটিনাটি জানবে, তার কেমন তুমুল আনন্দ হবে, ভেবে দেখো তো!
কিন্তু না, এই ডায়েরি পড়ে সে মোটেও খুশি হতে পারবে না। এই ডায়েরির কোনো কোনো পাতায় আনন্দ, কোনো কোনো পাতায় দু:খ। এই ডায়েরির সব চেয়ে করুণ কাহিনীটি জানতে ওর অবশ্য দুই ক্লাস অপেক্ষা করতে হবে না। সে মাস দুয়েকের মধ্যে জেনে ফেলবে অনেক কিছু। তাই বলে তোমরা কেউ আগ বাড়িয়ে ওকে বলতে যেয়ো না।
ঠিক আছে, ডায়েরি পড়া এখানেই থামিয়ে দিচ্ছি। আর মাত্র একটি পৃষ্ঠা পড়ি। এই পৃষ্ঠাটি আম্মুর চোখের জলে ঘোলাটে। ‘রাতুলসোনা,তোমার মায়ের মতো দু:খী কোনো মা পৃথিবীতে নেই। তোমাকে ভালবাসার জন্য, আদর দেওয়ার জন্য, খাইয়ে দেওয়ার জন্য, বুকে তুলে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার জন্য মা হয়ে আমি থাকবো না। মন খারাপ করো না সোনা, আমি না থাকলেও তোমার আব্বু তো আছে। তোমার দুই ফুফু আছে, তিনজন খালামনি আছে, তোমার আদর-যতেœর কোনো অভাব হবে না বাবা। তাছাড়া আমি চলে যাওয়ার কদিন পরই আব্বু তোমার জন্য নতুন একজন আম্মু নিয়ে আসবেন। দেখো, নতুন আম্মু তোমায় আদরে আদরে , চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে রাখবে। সাবধান, নতুন আম্মুকে কিন্তু একদম জ্বালাতন করবে না। লক্ষী হয়ে থেকো বাপ। এই নীল ডায়েরি, যার দুটি পাতা ছেঁড়ায় তোমার কচি পিঠে দু ঘা দিয়েছিলাম, বড় হয়ে এই ডায়েরিটি তুমি পড়ো। এতে তোমাকে নিয়ে তোমার আম্মুর ব্যাকুলতা ও স্বপ্ন খুঁজে পাবে। তোমাকে নিয়ে কত বড় বড় স্বপ্ন আমি দেখি, বড় হয়ে আমার স্বপ্নের সমান হওয়ার চেষ্টা করো। বুকের ভেতর হু হু করলে এই ডায়েরিতে আমায় খুঁজো। আর তোমার দু:খী আম্মুকে ক্ষমা করে দিয়ো। অসময়ে তোমায় ফেলে যেতে হচ্ছে। হ্যা, হ্যা, যেতেই হবে। দুই তিন মাসের মধ্যে আমাকে যে কোনো দিন যেতেই হবে। অচিনপুরের ডাক এলে সব ফেলে যেতে হয়, যেতেই হয়। আমাকে যেতেই হবে সোনা, যেতেই হবে। আমাকে ডেকে নিতে যে ক্যান্সার এসেছে’।
গল্পটি ‘ফুলকলি’ নবম সংখ্যায় প্রকাশিত

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন